ESTD. 2000 অঙ্কনতীর্থ • School of Arts & Drawing • Admissions Open 2026–27
Back to Atelier Gazette

রং রেখা হাসি গল্প আনন্দ

রং রেখা হাসি গল্প আনন্দ


নীলের (সুচন্দ্রীম রাউত) মতো কিছু শিশু আছে, যারা রং-রেখার মাধ্যমে নিজের মনের কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ করে। ক্লাসে এসে খাতা খুলেই নিজের মতো করে ছবি আঁকতে শুরু করে। অনেক সময় আমরা যে কাজটি করতে দিই, তার আগেই সে নিজের ভাবনাটা ছবিতে ফুটিয়ে তোলে। আমরা তাকে থামাই না। বরং তার সেই ছবিটা শেষ করতে দিই। তারপর সে আমাদের দেওয়া কাজটিও করে।

দু’ঘণ্টার ক্লাস তাই শুধু নির্দিষ্ট একটি ছবি শেখানোর সময় নয়। এই সময়ের মধ্যে থাকে নিজের ইচ্ছেমতো আঁকা, শেখানো, চেষ্টা করা, ভুল করা, হাসি-গল্প আর আনন্দ—সব মিলিয়ে একটি সুন্দর শিল্পচর্চার পরিবেশ।

আমরা শিক্ষক হিসেবে অবশ্যই চাই শিশুরা শিখুক। রেখা, আকার, অনুপাত, রং—যেখানে যতটা সংশোধন দরকার, আমরা করি। কিন্তু একটি শিশুর ছবিকে শতভাগ ‘সঠিক’ করে দেওয়াই আমাদের কাজ নয়।

কারণ, একটি ছোট্ট শিশুর আঁকা ছবিতে যদি প্রতিটি ভুল আমরা মুছে দিয়ে নিজেদের মতো করে নতুন করে আঁকতে শুরু করি, তাহলে শেষ পর্যন্ত সেখানে শিশুটির নিজের রেখাটুকুই আর থাকে না। ছবিটি হয়তো দেখতে ‘সুন্দর’ হবে, কিন্তু সেটি আর শিশুটির ছবি থাকবে না।

অনেক সময় অভিভাবক বলেন, “মানুষটা তো ঠিক মানুষের মতো হয়নি, এখানে কারেকশন করা হয়নি কেন?”

কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার—শিশুর ছবির ভুলগুলোই তার শেখার পথের অংশ। আজ যে মানুষটির হাত-পা ঠিক অনুপাতে হয়নি, আগামী দিনে সে নিজেই সেই অনুপাত বুঝতে শিখবে। শিক্ষক যদি প্রতিবার তার হয়ে ঠিক করে দেন, তাহলে শেখার সেই প্রক্রিয়াটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

যে শিশুরা একটু বড় হয়েছে, একটু বুঝতে শিখেছে এবং নিজের মনের ভাব ছবিতে প্রকাশ করতে পারছে, তাদের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সংশোধন ও নির্দেশনা অবশ্যই দরকার। কিন্তু ছোটদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো—তাদের নিজের রেখাটাকে বাঁচিয়ে রাখা।

আমরা অনেক সময় বড়দের চোখে দেখা ‘সুন্দর’ ছবির সঙ্গে শিশুর ছবিকে মেলাতে চাই। সেখানেই ভুলটা হয়। শিশুর ছবির সৌন্দর্য শিশুর মতো করেই দেখতে হয়। তার ছবিতে কতটা নিখুঁত আকার আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—সে কতটা আনন্দ নিয়ে আঁকছে, কতটা নিজের মতো করে ভাবছে এবং সেই ভাবনাকে কতটা সাহসের সঙ্গে রেখা ও রঙে প্রকাশ করছে।

শিশুকে শেখানো দরকার, কিন্তু তার হাতটা আমাদের হাতে নিয়ে ছবি আঁকা নয়। শিক্ষকের কাজ শিশুর হয়ে আঁকা নয়; শিশুটিকে নিজে আঁকতে শেখানো।

আর একটা কথা মনে রাখা ভালো—আজ যে শিশুটি আনন্দ করে ছবি আঁকছে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা চাপ, পড়াশোনা, পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং অভিভাবকের সিদ্ধান্তে হয়তো একদিন ছবি আঁকাটাই ছেড়ে দেবে। তাই অন্তত ছোটবেলাটুকু তার নিজের মতো থাকুক। খাতায় কিছু অসম্পূর্ণ রেখা থাকুক, কিছু ভুল থাকুক, কিছু অদ্ভুত আকার থাকুক—তার মধ্যেই তো তার শৈশবটা বেঁচে থাকবে।

কারেকশন দিয়ে নিখুঁত ছবি বানানো যায়।

কিন্তু স্বাধীনভাবে আঁকার আনন্দ একবার হারিয়ে গেলে, সেটাকে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।

তাই শিশুর ছবিকে শুধু ‘কতটা সুন্দর হয়েছে’ দিয়ে বিচার না করে একবার দেখুন—ছবিটা আঁকতে গিয়ে শিশুটি কতটা আনন্দ পেয়েছে। শিল্পচর্চার শুরুটা সেখান থেকেই।

Share:

More Stories & Notices

View All (112)